জুন 7, 2006

bonosai shilpo by mahbub morshed

বনসাই শিল্প
মাহবুব মোর্শেদ
শহরে, শহীদ বাবুরাম সড়কের ৩৩ নম্বর বাড়িতে বনসাই ব্যাপারটি প্রথম আমাদের মনোযোগ এড়িয়ে যায়৷ সেদিন ছিল রবিবার, সময়টা বছরের গ্রীষ্মকাল৷ ‘অরিয়েন্টাল টকিজে’র অচল ভবনের পাশে মরা সাপের মতো পড়ে থাকা বাবুরাম সড়কের দেহে পা রেখে চতুর্থবারের মতো ওই রবিবার আমরা চমকে উঠেছিলাম৷ সন্ধ্যা-উত্তর গাঢ় অাঁধারিতে অতি সাবধানে পা ফেলতে ফেলতে, তেত্রিশ সংখ্যাটি ৩ দিয়ে ১১ বার বিভাজ্য, এককথাই ভাবছিলাম৷ বাসবী দত্তও দরজা খুলে চমকে উঠেছিল৷ এভাবে চমকে দেয়া আমাদের উদ্দেশ্য ছিল না৷ তবু সে চমকালে আমরা খুশি হয়ে উঠেছিলাম৷ সে হয়তো ভেবেছিল নিচতলাকে একতলা ভেবে আমরা তার দরজার সামনে গিয়ে দাঁড়িয়েছিলাম৷ ভুল কিন্তু করিনি, একতলার অমিত্রাদির সাথে সেদিন কোনো কথা ছিল না৷ বাসবী দত্তের সাথে ছিল৷ বসবার ঘরে বসতে দিয়ে বাসবী ‘তোদের জন্য চা করতে যাই৷ দাদাকে পাঠাচ্ছি, গল্প কর৷’ বলেছিল৷ ওরা সম্ভবত এতক্ষণ ঠাকুরঘরে ছিল৷ দাদার পোশাক থেকে ধুপধুনোর ঘ্রাণ আসছিল, হয়তো এ কারণেই৷ কিন্তু তার সাথে কিছুতেই আলাপ জমে উঠছিল না৷ ঝুরঝুরে হয়ে পড়া চুনের সিলিং এর দিকে বারবার চোখ চলে যাচ্ছিলো আমাদের৷ এতে আরো অস্বস্তি বোধ করছিলেন তিনি৷ কিছু করার ছিল না৷ তাই দ্বিধা ভরে একবার ফ্যান বাড়াতে, একবার টেবিলের এটা ওটা সাজাতে যাচ্ছিলেন৷ একবার…৷ শেষে ঘরের কোনার দিকে গিয়ে দাঁড়িয়েছিলেন, যেখান থেকে মানিপ্ল্যান্টের লতাগুলো উঠে জানালা ভরে তুলেছিল৷ তত্‍ক্ষণাত্‍ বিষয়ের প্রতি আমাদের মনযোগ ফিরে এসেছিল৷ স্বল্পায়তন ঘর জুড়ে থাকা গাছগুলো সম্বন্ধে সচেতন হয়ে উঠেছিলাম সকলে৷ তাকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, বৈজ্ঞানিক নাম কী মানিপ্ল্যান্টের৷ এতেই আলাপ জমে উঠেছিল৷ আগ বাড়িয়ে তিনি মানিপ্ল্যান্ট নিয়ে অনেক কথা বলছিলেন৷ গাছটির দু’দিনে একটি পাতা বেরোয়, লতা বাড়তে বাড়তে কখনো অনেক বেশি হয়ে গেলে মূলগাছ বাঁচিয়ে সাবধানে ধারালো ব্লেড চালাতে হয়৷ ইত্যাদি ইত্যাদি৷ এইসময় চোখের নিচে কালসিটে দাগ, ঘামসিক্ত কপাল আর চা নিয়ে বাসবী এসে দাঁড়িয়েছিল৷ যেন প্রথম থেকে লতানো গাছপালার আসরে আছে সে এমন ভঙ্গিতে দাদার আলাপে মন দিয়েছিল, চা বাড়িয়ে দেবার পর৷ ওদের দারুচিনির গাছ ছিল একটা৷ চা থেকে দারুচিনির কাঁচাপাতার সৌরভ উঠছিল৷ অথচ চায়ের জন্য তাকে ধন্যবাদ দিলাম না, এতই মগ্ন ছিলাম৷ এমনকি ঘরের ফার্ন, ক্যাকটাস বনসাইগুলো নিয়েও কথা ওঠেনি৷ বনসাইগুলো দেখিনি এমন নয়৷ কিন্তু তাতে ভালমতো নজরে দেয়া যায়নি৷ কিন্তু ঐ ভাসাভাসা দেখাটাই মনে ছিল৷ পরে কেউ জিজ্ঞেস করলে মানিপ্ল্যান্টের বৈজ্ঞানিক নাম ভুলে যেতাম আমরা৷ এবং বিস্ময়করভাবে বনসাইয়ের ডিটেইলস মনে পড়তো৷ ঐ দিনটির কথাও ভুলিনি৷ বাসবী দত্তর সাথে সেদিনই আমাদের শেষ সাক্ষাত্‍৷ তখনো, এবং এর পরবতর্ী দুইমাসে আমরা বনসাই নামটি জানতে পারিনি৷ অনাগ্রহ নয়, ব্যস্ততা ছিল৷ অর্থনৈতিক সাশ্রয়ের জন্য মূলশহর ছেড়ে ব্রহ্মপুত্রের পুরাতন খাতের পাশে উপশহরে চলে গিয়েছিলাম এসময়৷ তখন লোকজন ভাবতো, আমরা বোধহয় দূরের কোনো শহরে চলে গেছি৷ প্রকৃতপক্ষেই, তেমন ঘটতে পারতো৷ কারণ শহরে চাকুরির কোনো সুরাহা হচ্ছিল না৷ এ সময়, ৩৩ বাবুরাম সড়কে আমাদের প্রথম ও শেষ চিঠিটি পাঠিয়েছিলাম৷ শোনা যেত, একই শহরে লেখা এ ধরনের চিঠিগুলো নাকি রাজশাহী, ঢাকা ঘুরে শহরের প্রধান ডাকঘরে পৌঁছায়৷ দিনক্ষণের এই বোধ মনে রেখে আমরা ভাবছিলাম, অমিত্রাদির কথা, বাবুরাম সড়কে আমাদের ধারাবাহিক আড্ডার কথা এবং বনসাইয়ের নাম, পরিচয় এবং বনসাই করণের নিয়মাবলী জানতে চাওয়া আমাদের চিঠিখানা মঙ্গলবার দিন সকাল দশটা ত্রিশ মিনিটে দাদার হাত হয়ে বাসবী দত্তের হাতে পৌঁছে গেছে৷ এরপর ৭৬টি সকাল সাড়ে দশটা কেটে গেছে৷ তবু আমরা জানতে পারিনি বাসবী দত্ত চিঠিটি পেয়েছিল কি-না৷ কারণ, কোন উত্তর আমাদের হাতে আসেনি৷ ধীরে ধীরে বনসাই সংক্রান্ত ব্যাপারগুলো আমরা ভুলতে বসেছিলাম৷ ‘দৈনিক কল্যাণে’র অফিসে সংবাদের পিছনে ছুটবার যে কাজ পেয়েছিলাম তাতে গাছ-গাছালি থেকে দূরে থাকাটাই শ্রেয় ছিল৷ লেটার প্রেসের কালিঝুলি, তালামারা টেলিফোন সেট এবং সরকারি বরাদ্দের নিউজপ্রিন্টের মাঝে বসে আমরা চারপৃষ্ঠার ডবল ডিমাই ভরাবার সংবাদ খুঁজতাম৷ এই সময় ফিলিপস ১র্৪র্ সাদা কালো টেলিভিশনে কোনো উপলক্ষ ছাড়াই বৃক্ষ সম্পর্কিত একটা অনুষ্ঠান দেখেছিলাম৷ অনুষ্ঠানে একজন বটানিস্ট বোঝাচ্ছিলেন সূর্যের আলোর প্রতি বৃক্ষের সাড়া দেবার পদ্ধতিকে কাজে লাগিয়ে কি করে বৃক্ষের শাখাকে শৈল্পিক ভঙ্গিমায় বাঁকানো যায় অথবা শাখার স্থিতিস্থাপকতাকে কাজে লাগিয়ে ধাতব তার জড়িয়ে কি করে বৃক্ষশাখাকে ঢেউ খেলানো, অাঁকা-বাঁকা, গোলাকার ইত্যাদি শেপ দেয়া যায়৷ অনুষ্ঠানটি আবার বৃক্ষের প্রতি, বিশেষত বনসাইয়ের প্রতি আমাদের আগ্রহ বাড়িয়ে দিয়েছিল৷ এই সময় একদিন আমরা শুনেছিলাম একটি সাময়িক পত্রিকা নাকি বনসাই নিয়ে ক্রোড়পত্র প্রকাশ করেছে৷ তখনো আমরা জানতাম না বনসাই কী৷ প্রতিদিন শেষরাতে পত্রিকা অফিস থেকে আমরা সাময়িক পত্রিকাগুলো হিপ পকেটে করে ফিরতাম সেগুলো থেকে কোনো ফিচার তৈরি করা যায় কিনা এই আশায়৷ সেভাবে বনসাই সংক্রান্ত পত্রিকাটিও এসেছিল৷ আমরা জানতে পেরেছিলাম, বনসাই আসলে কী? এবং ছাপানো ছবি দেখে দেখে জানালা বেয়ে লতিয়ে ওঠা মানিপ্ল্যান্টের কথা মনে পড়েছিল তত্‍ক্ষণাত্‍৷ ওই পত্রিকাতেই লেখা হয়েছিল বনসাই হলো শিল্প৷ এতে আমাদের পুরাতন কামভাব জেগে উঠেছিল৷ আমরা দৈনিকের কাজ করতে করতে ভাবতাম শিল্পের খুব কাছাকাছি মহলে আমাদের কাজ কারবার৷ তাই একটি প্রশ্নই মনে জেগেছিল ‘কি করে?’ এবং এরপরেই ভীতি এবং অনিশ্চয়তা আমাদের জীবন ও চিন্তাকে অধিকার করে ফেলেছিল৷ একদিন, মজনুশাহকে- ‘ভাবেন বনসাই নাকি শিল্প৷’ বলেছিলাম আমরা৷ মজনু আমাদের চাচাত ভাই, মামা অথবা বন্ধু৷ ‘একটা গল্প বলি…’ বলে একটা সত্য কাহিনী শুনিয়েছিলেন মজনু শাহ৷ খুব ধীরে গোপন খবরের সূত্র বলে দেবার মতো করে বলেছিলেন, ডাবল ডেকারে বসে৷ অথবা কোনো থাই রেস্টুরেন্টে৷ একটা মানুষ ঢাকা গিয়েছিল ব্যবসা করতে৷ মটরের পার্টসের ব্যবসা শুরু করে চালিয়েও ছিল তিনমাস৷ তো, তাকে হঠাত্‍ একদিন থেকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছিলো না আর৷ মাস গেল, বছর গেল৷ আত্মীয়-স্বজনরা তার আশা ছেড়েই দিয়েছে৷ এই সময় তাকে খুঁজে পাওয়া গেল৷ ফার্মগেটে, ওভারব্রিজের বামপাশে৷ আল্লা নবীর নাম৷ … হাত পা নেই৷ চোখের কোটর খালি৷ স্মৃতি আছে কি নেই৷ ভিক্ষা করছে৷ মজনু শাহর মনে হয়েছিল লোকটি বনসাই৷ এখন অবশ্য আমাদের কেউ কেউ বলেন, মজনু শাহর সাথে আদৌ কোনো আলাপ ছিল না আমাদের, যেহেতু শহরে কোনো ডবল ডেকার চলে না, থাই রেস্টুরেন্টও নেই৷ কাহিনীটি সত্য-মিথ্যা যাই হোক, সে সময় আমাদের সাথে রাস্তা-ঘাটে অনেক খোড়া, নুলো ল্যাংড়াদের দেখা হতে থাকছিল৷ অথবা এমনও হতে পারে এদের প্রতিমুহূর্তে দেখে দেখে মজনু শাহর ঘটনাটি আমরা বানিয়ে নিয়েছিলাম৷ বানানো কথা হলেও এদের দেখে বনসাইয়ের পংঙ্গু, ল্যাংড়া, ঠেস দেয়া, তার জড়ানো গাছগুলোর ছবি মনে আসতো৷ আমরা ভাবতাম এর শিল্পমূল্য নির্ধারণ করা দরকার৷ কিন্তু শিল্পমূল্য নির্ধারণে ব্যর্থ হয়ে আমরা ভীতিগ্রস্ত হয়ে পড়েছিলাম৷ তখন ডাক্তাররা আমাদেরকে বনসাইয়ের কাছ থেকে দূরে সরে যেতে বলেছিল৷ খুঁজে খুঁজে সেনানিবাসের কাছে নবীপাড়ায় ঘর ভাড়া নিয়েছিলাম আমরা৷ সেনানিবাসের লোকেরা আর যাই করুক ফকির, ল্যাংড়া, নুলোদের কাছ থেকে দূরে থাকে, এই ভেবে৷ আমাদের ঘর হতে সৈন্যদের মার্চপাস্ট দেখা যেত৷ প্রতি সকালবেলা স্টপ, এ্যাবাউট টার্ন, হল্ট, এবং বুটের সম্মিলিত শব্দের সাহায্যে আমাদের ঘুম ভেঙে যেত৷ সৈন্যরা আমাদের ঘরের পাশ দিয়ে বাজারে কিংবা এক টিকেটে দু’টি ইংরেজি সিনেমা চলতে থাকা প্রেক্ষাগৃহে যেত৷ জলপাই কালারটি আমাদের প্রিয় হয়ে উঠেছিল৷ পাখি চেনার মতো কষ্ট স্বীকার করে আমরা একই বর্ণের পোশাক পরা সৈনিকদের ভিন্ন ভিন্নভাবে মনে রাখতে চেষ্ট করছিলাম৷ সেনানিবাসের লোকজনও নানা সূত্রে জানতো আমরা ‘দৈনিক কল্যাণে’র স্টাফ রিপোর্টার৷ একদিন ঘরের সামনে ডিজেল চালিত ইঞ্জিনের জলপাই কালার টয়োটা থামলে আমরা দেখি মেজর খালেকুজ্জামান নেমে আসছেন৷ ‘আমরা চাই আপনাদের সুকুমার প্রবণতাগুলোর বিকাশ ঘটুক৷’ শক্ত হাত বাড়িয়ে দিতে দিতে বলেছিলেন মেজর৷ তার কথামতো আমরা বিশাল বাউন্ডারির ভেতর শিশুদের লালন পালনের বিদ্যালয়ে সুকুমার বৃত্তির বিকাশ ঘটাতে গিয়েছিলাম৷ এখানে, শিশুদের মধ্যে সামরিক শৃংখলা প্রবল৷ কঞ্চি কাঁচা অবস্থাতেই বাঁকাতে হয় একথা মনে রেখে, ছোটবেলাতেই শিশুদের এখানে নিয়ে আসা হয়৷ তারপর মনের মাধুরি মিশিয়ে ছয়বছর ধরে গড়ে তোলা হয় পরিমিত আলোবাতাস ও নির্ধারিত তাপমাত্রায়৷ তাদের কথোপকথনের জন্য নির্বাচিত একহাজার শব্দ শেখানো হয়৷ এই শব্দের আওতার বাইরে তারা ভাব প্রকাশ করে না৷ এদের অন্তরের প্রধান, যৌথ সচেতনতা হলো- ‘দেশপ্রেম’৷ যৌনতা সংক্রামক একমাত্র শব্দ হলো ‘মার্চ এহেড’৷ শিশুরা আমাদের সামনে একই পোশাক সজ্জিত হয়ে মার্চ করলে আমরা অভিভূত হয়ে গিয়েছিলাম৷ ‘অদ্ভুত!’ বলেছিলাম আমরা৷ আমাদের পাশে দাঁড়ানো স্কুলের অধ্যক্ষ সস্নেহ হেসেছিলেন৷ ‘তবু দেশের ভাগ্য যে প্রতিবছর শিশুদের সবচেয়ে মেধাবি অংশটিকে এখানে পাচ্ছি আমরা৷’ স্বগতোক্তি করার মতো করে বলেছিলেন তিনি৷ মার্চপাস্ট দেখতে দেখতে, আমাদের চোখ একবার সারাবছর ধরে ফুটতে থাকা ফুলের গাছগুলোর দিকে চলে গিয়েছিল৷ আর একবার সমান করে কাটা ঘাসের দিকে৷ ‘হঁ্যা ওই ঘাষ অথবা গাছের সাথে তুলনা করতে পারেন৷ একজন মালির সাথেই তুলনা চলতে পারে আমাদের৷’ অধ্যক্ষ বলেছিলেন সাথে সাথে৷ আমাদের বুকের ওপর দিয়ে যেন গোখরা হেঁটে গেল এমনভাবে আমরা সামরিক বাহিনীর বন্ধুদের দিকে তাকিয়েছিলাম৷ আর মেজর জামান আমাদের চোখে মুখে রাষ্ট্রদ্রোহীভাব লক্ষ করে সাবধান থাকতে বলেছিলেন৷ তড়িঘড়ি আমরা ঘরে ফিরে ঘুমিয়েছিলাম৷ তাতে সংকট আরো বেড়ে গিয়েছিল৷ ঘুমের মধ্যে দেখতে পেয়েছিলাম স্কুল প্রাঙ্গণের প্রাচীর দেয়া বিশাল অঙ্গনে কোনো শিশু নেই৷ ছয় বছর ধরে বেড়ে ওঠা বনসাই পড়ে আছে সারি সারি৷ এই দৃশ্য দেখার পর ঐ দিন দ্বিতীয়বার আমাদের বুকের ওপর দিয়ে সাপ হেঁটে গিয়েছিল, সাথে সাথে স্বল্পায়তন ঘুমটি ভেঙে গিয়েছিল৷ পরের দিন সামরিক বাহিনীর বন্ধুরা বলেছিল, আমাদের চোখ নাকি পুরোমাত্রায় রাষ্ট্রদ্রোহী বনে গেছে৷ এই অবস্থা থেকে মুক্তি পেতে চাচ্ছিলাম বলে ঘর বদল করা ছাড়া অন্য কোনো উপায় ছিল না৷ নতুন যে-স্থানটিতে ঘরভাড়া নিয়েছিলাম সেটি স্পর্শকাতর ছিল না৷ অধ্যাপকদের বাসাবাড়ি ছিল সেখানে৷ গ্রুপ গ্রুপ কলেজ পড়ুয়ারা সারাদিন যাওয়া আসা করতো৷ সারাক্ষণ রমরমা একটা ব্যাপার ঘটতে যাচ্ছে এমন ভাবভঙ্গি ছিল এলাকাটার৷ বাসা নেয়ার ৪র্থ দিনে অধ্যাপক পাড়ার গোপিনাথ মোহান্ত সড়কে টাক মাথার এক অধ্যাপকের সাথে পরিচয়ও হয়ে গিয়েছিল৷ ‘আসেন একদিন বিকালবেলা৷ চা খাবেন৷’ বলেছিলেন তিনি৷ তার সঙ্গের লোকটির দিকেও তাকিয়েছিলাম৷ ‘চায়ের দাওয়াত রইলো৷ বিকালে আসেন একদিন৷’ তিনি পুনরাবৃত্তি করেছিলেন৷ সেদিন জানতে পারিনি, কিন্তু একদিন বিকালবেলা চা খেতে গিয়ে জেনেছিলাম তিনি হলেন ওই অধ্যাপকের ছাত্র৷ ‘আপনাদের পেশাটা বুঝলেন, সার্বক্ষণিক নতুন কাজের৷ ক্লান্তিহীন কাজ৷ আমরা বড় বোরিং কাজ করি৷ খুব রিপিট করে৷ একুশ বছর ধরে একই সিলেবাস৷’ বলে ‘একটু আসছি’ বলেছিলেন অধ্যাপক৷ এবং উঠে পাশের রুমে চলে গিয়েছিলেন৷ তখন ছাত্রটির কথা শুরু হয়েছিল- ‘শিক্ষকতা পেশাটা আসলেই ভীষণ রিপিট করে, বুঝলেন, প্রতিদিন একই বিষয়ে কথা বলা কত বোরিং ভাবতে পারেন?’ তখন শিক্ষকটি ফিরেছিলেন৷ এবং ছাত্রটিকে আমাদের জন্য নোনতা বিস্কুট আনতে বলেছিলেন৷ ‘ছয় বছর ধরে আমার সাথে আছে ও৷ খুব ব্রিলিয়ান্ট৷ পদার্থ বিজ্ঞানে এ শহরে আমার পরে ওই আছে৷’ নোনতা বিস্কুট আনতে গেলে ছাত্রটির প্রসঙ্গে বলছিলেন তিনি- ‘আমার হাতের নির্মাণ৷ তিলে তিলে গড়ে তুলেছি৷ ছয়বছর ধরে বেড়ে ওঠা বৃক্ষ বলতে পারেন৷ প্রথম দিকে খুব গ্রাম্য একটা ভাব ছিল৷ রাশিফলে বিশ্বাস করতো৷ ওর উদ্ভট চিন্তাগুলো বাড়তে দেইনি আর৷ আমার দার্শনিকতা দিয়ে সিক্ত করেছি ওকে৷’ এসব শোনার পর আমাদের পুরাতন বেদনাটা জেগে উঠেছিল৷ ম্যালামাইনের কাপে দেয়া চা বিস্বাদ লাগতে শুরু করেছিল৷ ‘একটু কাজ আছে৷’ বলে অর্ধেক চা খেয়ে উঠে দাঁড়িয়েছিলাম আমরা৷ সঁ্যাতসঁ্যাতে সন্ধ্যাটা বেপাড়ার রাস্তায় ঘুরে ঘুরে বেশ দেরীতে দৈনিকের অফিসে কাজ শুরু করেছিলাম সেদিন৷ পরদিনও আমাদেরকে খুব বিষণ্ন দেখাচ্ছিল৷ গোপিনাথ মোহান্ত সড়কের চৌরাস্তার মোড়ে অপরিচিত একজন লোক অন্তত তা-ই বলেছিলেন৷ ‘চারিদিকে এত বনসাই৷’ বলেছিলাম আমরা৷ ‘তো কী? গোটা সংসারটাই একটা বনসাই তৈরির কারখানা৷’ ‘সংসার’ শব্দটি উচ্চারণ করার সাথে সাথে আমরা তাকে দার্শনিক ভেবে নিয়েছিলাম৷ পরে অবশ্য তাকে সমাজতাত্তি্বক বলেও ভুল হয়েছিল৷ ‘কি করে?’ আমাদের স্বভাবসুলভ প্রশ্নটি করে বসেছিলাম৷ ‘এতগুলো লজ আর বাইন্ডিংস৷ ভাবেন আপনারা, প্রথম আইনটি যখন তৈরি হলো, তখন মানুষের একটি সম্ভাবনা কিন্তু বাতিল হলো৷ আর ধীরে ধীরে অসংখ্য অনুশাসন, অসংখ্য আইন৷ মানুষের অসংখ্য সম্ভাবনা বাতিল৷ তারপর সোসাইটি৷ সোসাইটি হলো স্বল্পায়তন একটি পাত্র৷ মানুষ অনুশাসনের ছুরি চালিয়ে নিজেকে সোসাইটি নামের টবে নিয়ে বসালো৷ মডার্ন সোসাইটি চায় এই স্বল্পায়তন পাত্রে থেকে চূড়ান্ত বিকশিত মানুষ৷ চূড়ান্ত শব্দটিও কিন্তু নির্ধারণ করে দেবে ইওর সারাউন্ডিংস৷ বৃক্ষের বেলা যেমন ঘরের তাপ, আলো, বাতাস নির্ধারণ করে দেয় কতটুকু বাড়বে গাছটি৷’ ‘কী নাম আপনার?’ প্রশ্ন করেছিলাম আমরা৷ তিনি মাছি তাড়াবার মতো করে এড়িয়ে গিয়েছিলেন৷ বলেছিলেন- ‘প্রশ্ন হলো, বনসাই শিল্প কিনা, প্রশ্ন করতে গিয়ে প্রথমে সোসাইটিকে প্রশ্ন করছেন না কেন? যেটি আর সকলের কাছে শিল্প হিসাবে গণ্য সেটিকে আপনারা সন্দেহ করছেন৷ ভাবছেন না কেন আপনাদের শিল্পবোধের বিচু্যতি ঘটে গেছে৷’ ‘বনসাই আমাদেরকে ভীত করে তোলে৷’ ‘পারিবারিকভাবে জীবন থেকে দূরে থাকার ফল এটা৷ হীনম্মন্যতা৷’ বলে নদীর দিকে চলে যাওয়া রাস্তা ধরে হেঁটে গিয়েছিলেন তিনি৷ আর কোনোদিন তাকে অধ্যাপক কলোনিতে কিংবা গোপিনাথ মোহান্ত সড়কে দেখা যায়নি৷ কিছুদিন আমরা ভেবেছিলাম- তিনি অন্য কোনো শহর থেকে এসেছিলেন৷ পরে শুনেছিলাম শহরের স্থায়ী বাসিন্দা তিনি৷ বছরখানেক আগে কেউ কেউ নাকি তাকে দোকানে ক-২ ব্রান্ডের সিগারেট খুঁজতে দেখেছিল৷ বাজার হতে একসময় হঠাত্‍ করে ক-২ সিগারেট উধাও হয়ে গেলে তিনিও নাকি উধাও হয়ে পড়েছিলেন৷ অর্থনীতির প্রভাষক ছিলেন বলে শহরের তরুণরা তাকে ক-২ স্যার বলে ডাকত৷ ক-২ স্যারের কথামতো আমরা পারিবারিক জীবনের প্রতি আগ্রহী হয়ে উঠেছিলাম৷ প্রাথমিকভাবে মধ্যম আয়ের একটি পরিবারে আমাদের যাওয়া-আসা শুরু হয়েছিল৷ সেখানে, পারতপক্ষে আমরা শিল্প ও বৃক্ষ নিয়ে কোনো কথা তুলতাম না৷ এমনকি পেশা নিয়েও নয়৷ আমাদের সম্মিলিত চেতনার আতঙ্ক সরাতে ভিন্ন কোনো উপায় ছিল না৷ সময়ে অসময়ে আমরা থানাপাড়ার পারিবারিক জীবনে গিয়ে উপস্থিত হতাম৷ একদিন গিয়ে দেখা গেল গৃহকর্তা নেই৷ তার বিকল্প রূপেও কেউ আসলো না বসবার ঘরে৷ টিকটিকির মতো আধঘন্টা নিষ্কাম হয়ে বসে থাকলাম৷ হয়তো আরো পনেরো মিনিট কেটে গিয়েছিল৷ এসময় নারী কন্ঠে আমাদের উদ্দেশে বলা কথা শুনে চমকে গিয়েছিলাম৷ ঘড়িতে সন্ধ্যা সাতটা বেজেছিল দেখেছিলাম৷ ‘এত আসেন ক্যান আপনারা৷’ খানিক রুক্ষ, বয়স্ক নারীকন্ঠ ভেসে আসছিল পর্দার ওপাশ থেকে৷ ‘আমরা ল্যাংড়া, নুলো, বনসাই আর স্কুল কলেজ ভয় পাই৷’ বলেছিলাম আমরা৷ ‘বাড়িতে তিনটা সোমত্ত মেয়ে৷ ওদের চলাফেলায় অসুবিধা হয়৷’ ‘অসুবিধা কী? আমাদেরও তো পারিবারিক জীবন দরকার৷’ পর্দার উদ্দেশে বলেছিলাম আমরা৷ ওপাশ থেকে বিরক্তি প্রকাশক শব্দ উঠেছিল তখন৷ কে যেন গৃহকর্তাকে বকা দিয়েছিল কটু শব্দে৷ ‘মেয়ে তিনটাকে ছয় বছর ধরে গাছ বানাইছে৷ বিয়া দেওয়ার নাম নেই, আর ঘরে দ্যাখো ছেলেপেলেদের আনাগোনা৷’ সমার্থক কথা ভেসে আসছিল থেকে থেকে৷ মেয়েদের পর্দা ঠিক নেই বলেও আক্ষেপ করছিলেন মহিলাটি৷ এই মেয়েগুলোও ছয় বছর ধরে নির্দিষ্ট তাপমাত্রা আর পরিমিত বাতাসে বেড়ে ওঠে বোধ হয়, ভাবছিলাম আমরা৷ তত্‍ক্ষণাত্‍ একতলার অমিত্রাদির কথা মনে পড়েছিল৷ মেয়েগুলোকে পর্দা মুড়িয়ে ছয়বছর রাখার পর কেমন ফ্যাকাসে বনসাইয়ের মতো লাগছিল তা দেখার প্রবল ইচ্ছা হচ্ছিলো৷ আবার প্রবল ভয়ও ছিল ভেতরে ভেতরে৷ তাই কাউকে না জানিয়ে সোজা শহীদ বাবুরাম সড়কে চলে এসেছিলাম, ওই বাড়ি থেকে বেরিয়ে৷ পারিবারিক জীবনেও বনসাই থেকে দূরে থাকতে না পেরে আমাদের মনে আবার অমিত্রাদিকে দেখার বাসনা জেগেছিল৷ এমনকি ল্যাংড়া, নুলো, শিশু, ছাত্র দেখলেও ভীত হবো না এমন প্রতিজ্ঞা করেছিলাম৷ পরে গতানুগতিক শিল্পবোধে ভেসে যাবার প্রবল ইচ্ছা নিয়ে প্রচার করতে শুরু করেছিলাম- বনসাই হলো শিল্প৷ সে বৃক্ষের হোক বা মানুষের৷

মার্চ 27, 2006

Order of Things by Mahbub Morshed

অর্ডার অব থিংস
মাহবুব মোর্শেদ

ঘরের বিন্যাস
বাসায় ঢোকার দরজা দুটি৷ প্রথম দরজা দিয়ে ঢুকলে সোজা ড্রয়িংরুম৷ দ্বিতীয় দরজা দিয়ে একটা ডানে টার্ন, তারপর ডাইনিং স্পেস৷ ডাইনিং স্পেসের পর কিটেন ও দ্বিতীয় বেডরুম৷ দ্বিতীয় বেডরুমের পর প্রথম মানে মাস্টার বেডরুম৷ মাস্টার বেডরুমের সঙ্গে অ্যাটাচড বাথরুম৷ এটা বাসার বাম দিকের বিন্যাস৷ ডান দিক, অর্থাত্‍ ড্রয়িংরুম হয়ে বাসায় ঢুকলে ওই ছয়কোনা রুমের দুটি দরজার ডানেরটি দিয়ে ঢুকলে প্রথমেই বাসার তৃতীয় বেডরুম- কখনো কেউ আতিথ্য গ্রহণ না করলেও এর নাম গেস্টরুম৷ গেস্টরুম থেকে বের হয়ে ডাইনিং স্পেস হয়ে প্রথম বেডরুমে ঢোকা যেতে পারে৷ দিক দুটোকে আলাদা বিবেচনায নিলে দুটো আলাদা চিত্র তৈরি হয়৷ প্রথম পথ অর্থাত্‍ ড্রয়িংরুমের দরজা দিয়ে ঢুকলে বাসাটির কৌণিক বিন্যাসগুলো স্পষ্ট হয়ে ওঠে৷ ড্রয়িংরুমের ষড়ভূজ বিন্যাস দৃশ্যমানতার ভেতর আধিপত্য তৈরি করে৷ এখান থেকে তৃতীয় বেডরুমে মানে গেস্টরুমে ঢুকলে এর চৌকোনা বিন্যাসকে ষড়ভূজ বিন্যাসের চেয়ে দুর্বোধ্য মনে হয়৷ এবং এ ঘর থেকে ডাইনিং স্পেসে ঢুকলে কিচেন, দ্বিতীয় বাথরুম ও অন্যান্য রুমের বিন্যাসে তৈরি হওয়া- আঠারোটি কোন একসঙ্গে দৃশ্যমান হয়৷ আঠারো কোনের এই বিন্যাস থেকে প্রথম বেডরুম পর্যন্ত প্যাসেজটিকে একটি গোলাকার গুহার মতো দেখায়৷ ঘর অন্ধকার থাকলে পথটি অগম্য মনে হতে পারে৷ আলো যদি শুধু প্রথম বেডরুমে জ্বলে তবে পুরো গুহাটি হালকা আলোয় একটি ফানেলের আকার ধারণ করে৷ আলো ডাইনিং স্পেসে জ্বললে ফানেলটি উল্টো করে রাখা মনে হতে পারে৷ এই আয়তাকার টানেল যা ক্ষেত্রবিশেষে গোলাকারও মনে হতে পারে তা-ই কার্যত ঘরগুলোর বিন্যাসের কেন্দ্রীয় বৈশিষ্ট নির্ধারণ করে দেয়৷ বাসায় আলোর বিন্যাস দ্বিতীয় দরজা দিয়ে ঢুকলে প্রথমে বামে মেঝে থেকে তিন ফুট উঁচুতে তিনটি সুইচ৷ প্রথমটি ডাইনিং স্পেস সংলগ্ন বাথরুমের, দ্বিতীয়টি টানেলের প্রথমভাগের শুরুতে বেসিনের ওপর বসানো বাল্বের৷ তৃতীয়টি সিঁড়ি ঘরের৷ এখানে বাথরুম বা বেসিনের ওপরের আলো জ্বালিয়ে অনায়াসে দ্বিতীয় সুইচবোর্ডে যাওয়া চলে৷ এখান থেকে চারফুট দূরে বামের দেয়ালের আড়ালে পাঁচটি সুইচ৷ তৃতীয়টি ডাইনিং স্পেস আলোকিত করে৷ মূল টানেলের আলোর ব্যবস্থা টানেলের দ্বিতীয় অংশের শুরুতে, কিচেনের সুইচবোর্ডের উল্টো দেয়ালে৷ ডাইনিং স্পেসে আলো থাকলে প্যাসেজের আলোর প্রসঙ্গ নাও উঠতে পারে৷ অর্থাত্‍ টানেলে ছড়ানো আলোর রেখা ধরে সোজা প্রথম বেডরুমের সুইচবোর্ড পর্যন্ত পেঁৗছানো যায়৷ প্রথম দরজা দিয়ে ঢুকলে সোজা পাঁচ ফুট হেঁটে ডানে টার্ন নিলে অর্ধচন্দ্রাকার ডিভানের বাম কোনায় পা ঠেকলে হাতের স্বাভাবিক উচ্চতায় পঞ্চম দেয়ালে সুইচবোর্ড৷ পাঁচটি সুইচের ডানেরটি ঘরের সাধারণ বাল্বের, চতুর্থটি ঝাড়বাতির, তৃতীয়টি ল্যাম্পসেডের, দ্বিতীয়টি ফ্যানের, প্রথমটি সকেটের৷ তৃতীয় বেডরুমের সুইচবোর্ড ঠিক উল্টোপিঠের দেয়ালে৷ অর্থাত্‍ এই অবস্থান থেকে দরজা ঠেলে দুইফুট পা বাড়ালে অগ্রবর্তী আরেকটি সুইচবোর্ড৷ যথারীতি সেখান থেকে প্যাসেজের মূল অংশের সুইচবোর্ড৷
আসবাবপত্র
প্রথম বিন্যাসে- ছোট তিনতলা জুতাদান৷ পাপোশ, চেয়ার, ডাইনিং টেবিল, ফ্রিজ, ওভেন ও টেবিল, দ্বিতীয় ফ্রিজ, সিঙ্ক, চুলা, বাসন-কোসনের র্যাক, বইয়ের আলমিরা, র্যাক, টেবিল, কম্পিউটার, বইয়ের তাক, স্টিলের আলমিরা, পাপোশ, ওয়্যারড্রোব, আলনা, টিভি, খাট, ড্রেসিং টেবিল, টুল, দোলনা চেয়ার…. দ্বিতীয় বিন্যাসে- পরপর তিনটি শখের হাড়ি, কার্পেট, সোফা, টব, ল্যম্পশেড, সোফা, টব, অর্ধচন্দ্রাকৃতি ডিভান, মিউজিক সিস্টেম, টেবিল, চেয়ার, খাট, ওয়্যারড্রোব…. এলোমেলো বিন্যাসে- কিচেনের ছোট ছাদ পুরো প্যাসেজে একটি ভীতিকর আবহ তৈরি করেছে সেখানে অগোছালো বিন্যাসে কুড়িটি ছোটবড় কার্টন, পুরাতন পেপারের দুটি গাদা৷ একটি ম্যাগাজিনের সতূপ৷
বসবাসরত প্রাণী
একটি ছোট ইঁদুর- কেবল গভীর রাতেই তার দেখা মেলে৷ ১৭টি তেলাপোকা, মশা হাজার তিনেক- নিধন সাপেক্ষে, চিনি জাতীয় কিছু থাকলে কালো পিঁপড়া তিনশ৷ মাছি ও টিকটিকি নেই৷ মানুষ একজন৷ আমার কথা বাসাটিতে আমি একা থাকি৷ একা থাকার জন্য একে প্রায় একটি সাম্রাজ্য মনে হতে পারে৷ আবার একটি বৃহত্‍ জঙ্গল মনে হওয়াও অস্বাভাবিক নয়৷ আমি রাতে বাসায় ফিরি৷ সকাল হলে বেরিয়ে যাই৷ ঠিক মনে করতে পারি না দিনের বেলা বাসাটিকে কেমন দেখায়৷ অফিসে বসে সরকারি বরাদ্দের বাড়িটির চেহারা আমি ঠিক মনে করতে পারি না৷ বন্ধুবান্ধবহীন অবিবাহিত জীবনে বাসাটি একসময় আমাকে অধিকার করে বসে৷ বাইরে থাকলে আমার শুধু ঘরে ফেরার কথা এবং ঘরে থাকলে বাইরে যাবার কথা মনে হয়৷ মাঝে মাঝে আমি সন্দেহ করি, এটা আসলে আমার পুলিশি চাকরির জীবনে কোনো বাসাই নয়৷ এটা বাইরে যাওয়া ও ঘরে ফেরার মাঝের একটা জটিল-বিন্যাসের সেতু৷ সাধারণত গভীর রাতে আমি বাসায় ফিরি৷ সিঁড়ি ঘরের হালকা আলো দেখে পথ চিনে পেঁৗছাই দুই দরজার সামনের একটা ফাঁকা স্থানে৷ দুই দরজাতেই তালা থাকে৷ দুটোর চাবিও থাকে আমার কাছে৷ ফলে, চাইলেই আমি বাম বা ডান দিক দিয়ে ঘরে ঢুকতে পারি৷ কিন্তু এই যে কোনো একটি দিক বেছে নেবার ওপর আমার পরবর্তী দিনটি কেমন যাবে তা নির্ভর করে৷ কেননা যে পথ দিয়ে আমি ঢুকবো আবশ্যিকভাবে সে পথ দিয়েই আমাকে বের হতে হবে৷ ফলে আমি সঠিক দরাজ দিয়ে প্রবেশ করছি কিনা এই ভাবনা খুব গুরুত্ববহ হলেও আমি কয়েক সেকেন্ডের একটা সুখবোধ করি৷ আমি এর নাম দিয়েছি নীতি-নির্ধারণী সুখ৷ এই ডিসিশন নিতে আমাকে অনেক কিছু সাটাসাট ভেবে নিতে হয়৷ ঘরের ভেতরটা আচানক আমার চোখের সামনে দিয়ে ভেসে যায়৷ ভুল ডিসিশন নিলে আর তার জন্য পরের দিন কোনো দুর্ভোগ তৈরি হলে আমি ঘরের প্রবেশের দরজা বেছে নেওয়ার প্রক্রিয়ার ওপর দোষ চাপাই৷ আমি এতটুকুই অদৃষ্টবাদী৷ কিন্তু বাসায় আমি যেভাবে পথ চলি তাকে আমাকে দৃষ্টবাদী বলারও কোনো সুযোগ নেই৷ বাসাটিতে আমার বসবাসের মেয়াদ ও বাসার সঙ্গে আমার আত্মিক বন্ধনের মধ্য দিয়ে এতে ছড়ানো বস্তুগুলোর সঙ্গে আমার যে রিলেশন তৈরি হয়েছে তাতে আমি খানিকটা অন্ধের মতো পথ চলি৷ বাসার কোনো কিছু সহসা স্থান বদল করে না৷ ফলে, যে জায়গায় যে চেয়ার তা সে জায়গাতেই থাকে৷ সকালে যে বিছানা রেখে যাই, রাতে তা-ই ফিরে পাই৷ ফলে পুরো বাসায় ঘুরতে আমাকে যে চোখ খোলা রেখেই পা ফেলতে হয় তা ঠিক নয়৷ আমি আসলে এই অর্ডার অব থিংসের মধ্যে একধরনের অন্ধত্বের আনন্দ বোধ করি৷ পেশায় পুলিশ, গোয়েন্দা বিভাগে নিযুক্ত৷ তথাপি আমি পড়াশুনা করি৷ গভীর রাত অব্দি জাগি, অনিয়ম করি৷ স্ট্যাডি অর্থাত্‍ দ্বিতীয় বেডরুমে আমার অনেকটা সময় কাটে৷ বাসায় এই অবস্থানকে তুলনা করতে পারি- বোর্হেসের অন্ধত্বের সময়ের অভিজ্ঞতার সঙ্গে৷ সম্ভবত সেটা যুত্‍সইও৷ কিন্তু হঠাত্‍ এক রাতে আমি বিস্ময়ে- বিমুঢ় হয়ে পড়ি৷
একরাতের ঘটনা
মেটামরফসিস পড়ছিলাম৷ কখন কী ঘটেছে জানি না৷ কত সময় গিয়েছে তাও বলতে পারি না৷ হঠাত্‍ তন্দ্রা ভর করেছিল৷ হঠাত্‍ তন্দ্রা টুটলে আচানক জাগরণের ধাক্কায় স্তম্ভিত হয়ে পড়ি৷ বিছানায় শুয়ে বই পড়লে এমন হয়৷ হতে পারে৷ কিন্তু বসে পড়লে এমন ঘটে না৷ শুয়ে হালকা গোছের চিন্তাহীন বই আমি পড়তে পারি, কিন্তু ভারি কোনো কিছু পড়তে গেলে দিনের সব ক্লান্তি এসে একবারে শরীরে ভর করে৷ চেয়ারে বসেই পড়ছিলাম বলেই মনে আছে৷ তন্দ্রা থেকে জেগে একটু অবাক হলাম৷ স্বাভাবিকভাবে আমার টেবিলে উপুড় হয়ে বসে থাকার কথা৷ চোখ খুলে সোজা বইয়ের তাক দেখা যাবার কথা৷ কিন্তু তা দেখতে না পেয়ে একটা অচেনা শঙ্কা জাগে৷ তবে কি টেবিলে চিত্‍ হয়ে শুয়ে আছি? চিত্‍ হয়ে শুলে চোখে পড়বে ফ্যানঅলা ছাদ৷ কিন্তু তাও দেখা যাচ্ছে না৷ তবে কি উল্টো হয়ে শুয়েছি? তবে চোখ খুললে সোজা মেঝে দেখা যাবার কথা৷ না আপাতত কোনো মেঝে জাতীয় ব্যাপার চোখে পড়ছে না৷ তবে কি আমি স্ট্যাডি নয় প্রথম বা তৃতীয় বেডরুমে শুয়ে আছি? অথবা যা কখনোই ঘটে না, অন্য কারও বাসায় ঘুমিয়েছি? না, অফিস শেষ করে সোজা বাসায় ফিরেছি৷ খেয়ে পড়তে বসার আগের আর কোনো ঘটনা আমার মনে পড়ে না৷ তবে কি দুঃস্বপ্নের ভেতর জাগনা পেয়ে ভয় পাচ্ছি শুধু শুধু? আর একটা ব্যাপার, আমার মনে হচ্ছে আমি চিত্‍ হয়ে আছি, কিন্তু চিত্‍ হয়ে শুয়ে থাকার মতো আরাম লাগছে না৷ বরং উপুড় হয়ে আছি মনে হচ্ছে, ঠিক তাও না- হাত-পায়ের অাঁকশির সাহায্যে স্রেফ দেয়াল অাঁকড়ে ধরে আছি৷ এবার নিশ্চিত যে আমি গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন৷ সেখান থেকে স্বপ্ন দেখছি এবং স্বপ্নে উল্টাপাল্টা ভাবছি৷ ব্যস নিশ্চিন্ত৷ কিন্তু নিশ্চিন্ত বললেও নিশ্চিন্ত থাকা যাচ্ছে না, প্রথম ও প্রধান সমস্যা চেতনা৷ স্বপ্নের ভেতর এত সজাগ চেতনা কোনো দিনই আমি পাইনি৷ ফলে স্বপ্নটা হজম করতে একটু কষ্ট হচ্ছে৷ আড় চোখ চারদিকে তাকাই৷ উপরের দিকে অর্থাত্‍ নিচের দিকে তাকাতেই প্রাণ যাওয়ার অবস্থা হয় আমার৷ মহাশূন্যে ঝুলে আছি রীতিমতো৷ কোনো অবলম্বন ছাড়া, স্রেফ ঝুলে আছি৷ এ কেমন কথা? বৈজ্ঞানিকভাবে এটা সম্ভব নয়৷ তারপরও ঝুলে থাকা থেকে একটু সরে আসি৷ হঁ্যা, সরা যায়৷ দেহের ভর স্বাভাবিকের চেয়ে ৩০০০ভাগ কমে এসেছে৷ পা দেয়াল আকৃষ্ট করে থাকতে পারছে৷ সবচেয়ে বড় কথা, আমি সামনে পিছনে তাকাতে পারছি, এমনকি নিজের দেহটাকেও দেখলাম একবার৷ আরও বিস্ময় অপেক্ষা করছিল সেখানে, রীতিমতো টিকটিকির রূপ পেয়েছে দেহটা৷ মেটামরফসিস? নিমেষে আইডিয়াটা মাথায় ঝড় বইয়ে দেয়৷ কিন্তু স্রেফ একটা টিকটিকি? একটা টিকটিকি হলাম! নিজের এই পরিণতিতে তীব্র অট্টহাস্য জাগে৷ অট্টহাসির বদলে আমি এমন একটা শব্দ নিজের কানে শুনি যাকে অট্টহাসি নয় স্রেফ একটা ফুঁ বলা যায়৷ কোথাও আর মুখ দেখানোর জায়গা থাকলো না৷ কাউকে বলাও সম্ভব নয়, এক তন্দ্রার অবকাশে স্রেফ টিকটিকিতে পরিণত হয়েছি৷ বলা না-বলা পরের কথা, আপাতত ছাদ থেকে নামতে চাই আমি৷ মেঝেতে না নামলে, ঘরের অর্ডার অব থিংসটা আমার কাছে স্পষ্ট হচ্ছে না৷ মোটকথা, টিকটিকি হিসাবে আমার কোনো স্মৃতি নেই৷ থাকলে তার বয়স স্রেফ কয়েক মিনিট৷ ফলে আপাতত মানুষের স্মৃতিনির্ভর হয়েই আমাকে চলতে হবে৷ টিকটিকির চিন্তায় মানুষের চিন্তা ঢোকাতে হবে৷ একটা সমন্বয় স্থাপন করতে হবে৷ যেমন নামতে গিয়ে পড়ে যাবার মানবিক ভয়টা আমি পাচ্ছি বটে কিন্তু ছাদে যে স্রেফ ঝুলে আছি তাতে এক ধরনের টিকটিকীয় নির্ভরতাও জাগছে৷ দেখতে পাচ্ছি অল্প৷ তাতেই সই, বুক ধক ধক করে চলতে শুরু করলাম৷ সম্ভবত ঘন্টা তিনেকের মধ্যে একটা টিউব লাইটের পাশ দিয়ে, রবীন্দ্রনাথের পোস্টার হয়ে, মার্চ মাসের ক্যালেন্ডার পেরিয়ে নেমে এলাম মেঝেতে৷ টিকটিকিদেরকে বেশ দ্রুতই চলতে দেখা যায়৷ আমার বেলায় আতেটা সময় লাগায় অনুভব করি, আমার পূর্ণ রূপান্তর ঘটে নাই৷ অথবা স্বল্পায়ু প্রাণীর আয়ু লাভের কারণে সময় বিষয়ে আমার ভাবান্তর ঘটে গেছে৷ মেঝে থেকে রিডিং টেবিলের ওপর উঠে আমি প্রথমেই গোলমালটার উত্‍স সন্ধান করি৷ কোন দুঃখে যে মেটামরফসিস বইটা পড়তে ধরেছিলাম৷ মেটামরফোসিসের ওপর উঠে কয়েকটা লাইনের ওপর দিয়ে হেঁটে আসি৷ গ্রেগর সামসা নামটা সহসাই মনে পড়ে৷ নিজের মনে হেসে উঠি৷ চিন্তাশুদ্ধ পুরো টিকটিকি হয়ে গেলে হয়তো এসব ভাবা সম্ভব হবে না৷ যতোক্ষণ ভাবা যাচ্ছে ভাবি৷ ভেবেছিলাম, হয়তো বা কাক হবো৷ কীসের কি টিকটিকি হয়ে পড়ে আছি৷ বাইরের দুটো দরজাই বন্ধ৷ টিকটিকি অবস্থায় দরজা খোলার সাধ্য আমার নেই৷ অবশ্য তাতে আমার বের হওয়ার অসুবিধা নেই৷ দরজার নিচ দিয়ে দিব্যি বের হতে পারি৷ কিন্তু যাবো কোথায়, অফিসে? কী করবো অফিসে গিয়ে? আমিই যে সেই গোয়েন্দা কর্মকর্তা সেটা কেউ বিশ্বাস করবে? না কি আমি তা বলতে পারবো? তাছাড়া রাস্তায় কারো ঠ্যাংয়ের নিচে চ্যাপ্টা হয়ে গেলে কিছু বলার থাকবে না৷ সব ভেবে চিন্তে ঘর থেকে বেরুবো না বলেই মনস্থ করলাম৷ পেটার বেকসেলের বইটা টেবিলের এক পাশে বন্ধ অবস্থায় আছে, আমার সাধ্য নেই উল্টিয়ে পড়বো৷ খোলা আছে শুধু মেটামরফসিস৷ পড়া যায়, চাইলে দুএকটা পাতা কসরত্‍ করে উল্টিয়ে দিতে পারি৷ এমন একটি মহান গ্রন্থ পড়া শেষ না করেই টিকটিকি জীবন শুরু করবো? তলস্তয় পড়লাম না, দস্তয়েভস্কি পড়লাম না৷ রবীন্দ্রনাথেরও কত কিছু বাকী৷ এই অবস্থায় আচানক এই টিকটিকি৷ নিঃসঙ্গ, একা৷ ভ্যান্টিলিটার বেয়ে পাশের বাসার ব্যক্তিগত জীবনে হানা দিতে পারি৷ নিজের টেলিভিশন তো ছাড়তে পারবো না৷ ওদের টেলিভিশন আছে, চাইকি দু’একটা খবর শোনা, অনুষ্ঠান দেখা যেতে পারে৷ ঘরে বসে দুনিয়ার হালচাল বোঝার একটাই উপায়, ভাবি আমি- মানুষের সাথে সম্পর্ক রাখা৷ প্রতিবেশীদের ওপর চোখ রাখা৷ তারা কই যায়, কী করে, কী বলে৷ টিকটিকি সম্পর্কে সময় থাকতে পড়াশুনা না করায় পস্তাই খানিক৷ নিজে টিকটিকি হয়েও কত কম জানি এখন৷ অথচ মানুষ সম্পর্কে কত জ্ঞান আমার৷ টিকটিকির লেজ নড়বড়ে, কিন্তু এটা মূল্যবান অঙ্গ- এটুকুই আমার জ্ঞান৷ লেজ নেড়ে অনুভব করি৷ মানুষ নুনুর মতোই মহাঘর্্য এক বস্তু মনে হয় একে৷ কিন্তু স্পর্শকাতর অঙ্গটি নিশ্চয়তার বদলে খানিকটা ভয়ই ধরায়৷ অঙ্গটি বাঁচাবার প্রাণপণ চেষ্টায় আমার কর্তব্য নির্ধারিত হয় কোনো অবস্থাতেই মানুষের হাতের নাগালে চলে না যাওয়া৷ এ অবস্থায় বাইরে কি এ ধরনের প্রচারণা চলতে পারে যে, আমাকে খুন করে গুম করে দেয়া হয়েছে?

মার্চ 27, 2006

Si Pei By Mahbub Morshed

সি পেই
মাহবুব মোর্শেদ

যার কথা প্রায় ভুলতেই বসেছিল সকলে সেই বাবু হঠাত্‍ জাপান থেকে ফিরে এলো৷ বাবু লক্ষ্মী ছেলে৷ তাকে ফিটফাট, নির্বিরোধী, নিপাট ভদ্র ছেলে হিসেবে জানত সবাই৷ এ ধরনের ছেলেরা সাধারণত কারও ক্ষতি করে না, গায়ে পড়ে কারও উপকারও করতেও যায় না৷ সামনে থাকলে সবাই বলে ছেলেটা বড় ভাল, কিন্তু পেছনে গেলে কেউ আর বলে না, আহা অমুক সাহেবের ছেলেটাকে দেখি না অনেক দিন, গেল কোথায়? বাবু জাপান গেলে তাই কারও তার কথা সহসা মনে হয়নি৷ কিন্তু রফিক সাহেব, তার স্ত্রী ফাতেমা এবং পরিবারের সকলের ক্ষণে ক্ষণে মনে পড়তো তার কথা৷ বাবু নিয়মিত চিঠি লেখে না, নিয়ম করে মেইলটা পর্যন্ত করে না, এই নিয়ে সব সময়ই তারা চিন্তায় থাকতো৷ ইমেইলের কথা সব থেকে বেশি মনে পড়তো নিতুর৷ বাবুর সাথে যোগাযোগ রাখার জন্য ইমেইলের মতো কঠিন কাজটা অনেক যত্নে শিখে নিয়েছিল সে৷ কিন্ত বাবু মেইল করে না দেখে সে ভাবতো এখন যদি ভুলে যেতে পারতো বিদ্যাটা৷ কখনও কখনও পরিবারের সকলের মনে হতো, ছেলেটা কি তবে ভুলেই গেল তাদের৷ নিতু মাঝে মাঝে দুষ্টামি করে মাকে ক্ষেপানোর জন্য বলতো- দেখো তোমার ছেলে জাপানে কোনও মেয়েকে হয়তো বিয়ে করে সংসারি হয়ে গেছে৷ ফাতেমার মনে তখন একটা সংশয় দানা পাকিয়ে উঠতো৷ তিনি মেয়ের সাথে যুক্তি করতেন৷ নিজেকে নয়তো মেয়েকে বোঝানোর জন্য বলতেন, জাপানে মেয়ে পাবে কই? কেন সেখানে বাঙালি আছে না? পাল্টা প্রশ্ন করে মায়ের সন্দেহ ঘনীভূত করে তুলতো নিতু৷ অবশ্য এইসব বলা-কওয়া বা যুক্তি-তর্কই সার৷ নিতু নিজেই বিশ্বাস করতো না তাদের না জানিয়ে তার ঠাণ্ডা আলাভোলা ভাইটি বিদেশে গিয়ে একটা বিয়ে করে ফেলতে পারে৷ কথাবার্তা যা হতো সব মা-মেয়ের মধ্যে৷ রফিক সাহেবের চালচলন ভারিক্কি৷ তিনি সাংসারিক আলাপ-আলোচনায় ছেলে-মেয়েদের সঙ্গে সরাসরি কথা বলতে পছন্দ করেন না৷ ছোটবেলা থেকে বাবু ও নিতুর মধ্যে তাকে নিয়ে একটা অজানা ভীতি ও রহস্য৷ তাদেরকে কোনও কথা বলতে চাইলে তিনি ফাতেমাকে মিডিয়া হিসাবে ব্যবহার করেন৷ কদাচিত্‍ বাবুর বেখেয়াল নিয়ে প্রশ্ন তার মধ্যে জাগে না এমন নয়৷ কিন্তু এ নিয়ে নিজের মতো করে ভাবেন তিনি৷ উত্তরও খুঁজে বের করেন সেভাবেই৷ সংসার তার কাছে সিরিয়াস ব্যাপার৷ তিনি চান, কথাবার্তা বলে একে হালকা না করতে৷ নিতু ভাইয়ের ফেরার অপেক্ষায় থাকতো সারাক্ষণ৷ ভাবতো, জাপান থেকে ভাই তার জন্য বড় মানুষের সমান কয়েকটা পুতুল আনবে৷ বড় একেটা কাগজের বাক্স খুলে বলবে, দেখ কী আনলাম তোর জন্য৷ জাপানিরা পুতুল খুব ভালোবাসে, বুুঝলি৷ এই কারণে তাদের সবার চেহারা পুতুলের মতো৷ ফাতেমার সাধ ছেলে কিছু জাপানি রান্না শিখে এসে তাকে রাঁধতে শেখাক৷ রান্নাবান্না তার কাছে প্রায় নেশার মতো৷ একেকটা তরকারি রান্না করতে করতে তিনি ভাবেন, কে জানে জাপানে এইটা কেমনে রাঁধে? ছেলেটাই বা কী খাচ্ছে? পরিবারের তিন সদস্যের ভাবনা, জল্পনা-কল্পনার ছেদ ঘটিয়ে নো মেইল নো চিঠি নো ফোন, একেবারে বিনা নোটিশে এক সন্ধ্যাবেলা বাবু হাজির৷ আর এই হাজির হওয়াটা স্রেফ হাজির হওয়াই নয়, রীতিমতো এক ঘটনা৷ বাড়ির সকলকে তো বটেই, পাড়া-প্রতিবেশীকেও অবাক করে দিল৷ তার ফেরা নিয়ে আলোচনা চলতে থাকলো কয়েক মাস৷ সন্ধ্যায় সে এসে পেঁৗছালো আর রাত নটা নাগাদ বাড়ি লোকে লোকারণ্য৷ সবাই দেখলো বাবু, তার মা এবং নীতু একটা জাপানি মেয়েকে ঘিরে বসে আছে৷ রফিক সাহেবকে দেখা যাাচ্ছে না৷ সম্ভবত তিনি ঘরের মধ্যে গুম হয়ে আছেন৷ এত গুরুতর ঘটনাতেও তার প্রতিক্রিয়া নিশ্চুপ থাকার৷ অথবা উত্তেজিত হলেও যথাসম্ভব ব্যক্তিত্ব দিয়ে চাপা রাখছেন৷ প্রতিবেশীরা নিতুকে ডেকে নিয়ে নিয়ে জিজ্ঞেস করছিল, জাপানি মেয়েটা কে? বাবু কেন তাকে বাড়ি নিয়ে এলো ইত্যাদি ইত্যাদি৷ নিতু ধৈর্যের সাথে তাদের বোঝাচ্ছিল, তার ভাই জাপান গেলে হঠাত্‍ একদিন এক মেলায় সি পেই অর্থাত্‍ এই মেয়েটার সাথে আলাপ-পরিচয় হয়৷ প্রথম দেখাতেই ভাল লেগে গেল, তারপর প্রেম-ভালাবাসা৷ তারপর আর কী? এবার ফেরার পথে একেবারে বিয়ে করে নিজের সঙ্গে নিয়ে ফিরল৷ এসব শুনতে শুনতে প্রতিবেশীরা বুঝতে পারে, সি পেইও বুঝতে পারছে তাকে নিয়েই কথা হচ্ছে৷ সি পেই তাদের উদ্দেশে হাসে, মাথা ঝুঁকিয়ে সম্মান দেখায়৷ সকলে তার এই কাণ্ড দেখে হেসে তালি দিয়ে রীতিমতো একটা মজমা তৈরি করে ফেলে৷ কেউ বলে, এতো দেখি একেবারে পুতুলের মতো৷ গাটা যেন ননীর তৈরি৷ কেউ বলে, নিতু তোমার ভাবীকে আমরা ছুঁয়ে দেখবো৷ নিতু ভাবে কী ঝামেলায় না পড়া গেল৷ এ কি জাপানি পুতুল? পুতুলের মতো দেখতে বটে কিন্তু এরে তো প্রাণ আছে৷ সবাই একবার করে ছুঁয়ে দেখলে এ তো পুরোটা ক্ষয়ে যাবে৷ সে দূর থেকে ভাবীকে আগলে রাখার ভান করে বলে- না না৷ মনে মনে অনেক দায়িত্ব বোধ করে৷ সি পেইকে রক্ষণাবেক্ষণের মূল দায়িত্ব যে তারই সেটা সে বুুঝে নেয়৷ মধ্যরাতে পাড়া-প্রতিবেশীর ভীড় কমে গেলে নিতু সি পেইকে পাহারা দেয় আর ফাতেমা বউ-ছেলের জন্য ঘর গোছাতে থাকেন৷ একেবারে ফিটফাট করে ঘর গুছিয়ে এত্তটুকু সি পেইকে প্রায় কোলে করে ঘরে নিয়ে যান৷ সি পেইকে ছুঁয়ে তিনি একেবারে মোহিত৷ তার মনে হয়, এ মেয়ে মাখনের তৈরি না হয়েই যায় না৷ না জানি তার ছোঁয়ায় সি পেইর গায়ে কোনও আঘাত লাগলো কিনা৷ সি পেই জাপানি হলেও ভাঙ্গা ভাঙ্গা বাংলা বলে, সামান্য বোঝেও৷ কিন্তু যতটা বোঝে তার চেয়ে বেশি সে অনুভব করে৷ অনুভূতি যা বলে তাতে খুশি হয়ে ওঠে আপন মনে৷ নিতু আর ফাতেমার আপ্যায়নে বোঝে তাকে তারা খুব আপন করে নিয়েছে৷ অনুভবের ভাষা দিয়ে সে কথা বলে ওঠে৷ ফাতেমা তার কাছে গেলে, তাকে নির্বাক বাচ্চা মেয়ের মতো অাঁকড়ে ধরে৷ এই স্পর্শে ফাতেমা কেঁদে ফেলেন৷ বাবু একটা বিশ্বসুন্দরীকে বিয়ে করলেও তিনি খুশি হতেন না, যতোটা খুশি সি পেইকে বিয়ে করে আনায়৷ মনে মনে তিনি জাপানি জাতটার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন- তারা এত সুন্দর পুতুলের মতো মেয়ে তৈরি করেছে বলে৷ আর বিরক্ত হন, বাবুর বাবার ওপর৷ যতটা খুশি হওয়া দরকার, ততোটা খুশি কেন হচ্ছেন না কেন তা ভেবে৷ বাবু সি পেইর সাথে মাঝে মাঝে ফিসফাস করে কথা বলে৷ তাকে এটাসেটা বুঝিয়ে দেয়৷ সি পেই হাসে৷ কথায় কথায় মাথা নোয়ায়৷ বিরামহীনভাবে সকলকে ধন্যবাদ দিতে থাকে৷ নতুন দেশটিতে সে যে খুব সুখী হবে বুঝতে পারে৷ চারদিকে ছোট ছোট জ্বলজ্বলে পুতুলের চোখ নিয়ে তাকায়৷ সবকিছু চিনে নিতে চায়৷ সব ভাল লাগে তার৷ নিতুকে ভালোবাসা জানায়৷ পরিবারের আর সকলের মতো রফিক সাহেবকে একটু দূরের মানুুষ হিসেবে অবাক হয়ে দেখে৷ বুঝতে চেষ্টা করে, তার আসাটাকে কীভাবে নিয়েছেন রফিক সাহেব৷ পরদিন থেকে সবার মুখে মুখে শুধু সি পেই৷ সি পেই কেমন করে হাসে, মাথা নোয়ায়, তার নাকটা কেমন বোঁচা, চোখ কেমন ছোট তারপরও কেমন সুুন্দর, বাড়িতে থাকলে কী পরে, কাঠি দিয়ে কেন ভাত খায়, ওদের প্রেম কভিাবে হলো, কীভাবে সকলের চোখ ফাঁকি দিয়ে জাপান থেকে ভেগে এলো এইসব হয়ে ওঠে সবার আলোচনার বিষয়৷ মাথা নিচু করে রাস্তা দিয়ে হেঁটে যাবার সময় পাড়ার মেয়েরা অবাক হয়ে বাবুর দিকে তাকায়, তাদের মনে হতে থাকে কেন যে আগে তার প্রেমে পড়লো না৷ বাবু জাপানি কেতা অনুসারে ফুলবাবু হয়ে ঘোরে৷ সবাইকে সালাম দেয় আর কেউ তাকে ভাল-মন্দ জিজ্ঞেস করলে মাথা নুইয়ে সম্মান দেখায়৷ পাড়া জুড়ে সবাই ধারণা করে জাপানি জাতটা হলো অমায়িক৷ মানুষকে সম্মান দেখাবার ক্ষেত্রে রীতিমতো ওস্তাদ৷ বিকাল হলে বাবু আর সি পেই ঘুরতে বের হয়৷ একটু দূর থেকে নিতু তাদের অনুসরণ করে৷ এরেকম হাঁটতে হাঁটতেই হঠাত্‍ সি পেই পিছন ফিরে নিতুকে জড়িয়ে ধরে৷ দেখে সবাই বলে, আহা পুতুলের মতো মেয়ে৷ সকলের সামনে এই আলিঙ্গনে নিতুর মনে হয়, জাপান দেশের সব থেকে দামী পুতুলটা আনলেও এতটা খুশি হতো না সে৷ ইতিমধ্যে সে তাকে ভাবী বলে ডাকতে শুরু করেছে৷ আর সি পেই বুুঝে নিয়েছে ভাবী হলো, ভাইয়ের বউ৷ অথবা আদর করে ভাইয়ের বউকে ভাবীই ডাকে এদেশের লোক৷ ফাতেমা রান্নার সময় সি পেইয়ের জন্য আলাদা পদ তৈরি করেন৷ জাপানিরা ঝাল একদম কম খায়, শাক-সব্জি প্রায় ভাপানোটা পছন্দ করে, সেই মতোই তিনি সি পেইয়ের জন্য রাঁধেন৷ সি পেই রাঁধতে চাইলে নিষেধ করেন৷ কারণ আগুনে তার সুন্দর গোলাপী ত্বকের ক্ষতি হতে পারে৷ দূরে উঁচু টুলের ওপর বসে সি পেই তাকে জাপানি রান্না শেখায়৷ তিনি রান্না পরখ করে যখন দেখেন ভাল হচ্ছে, স্বাদটা প্রায় বিদেশী খাবারের মতো, তখন রান্নার সাফল্যে সি পেইকে কোলে তুলে আদর করেন৷ মনে হয় সি পেই তার ছেলের বউ নয়, এ হলো রান্না শেখাবার জাপানি পুতুল৷ প্রতিবেশীরা বউ দেখার জন্য বারবার বাবুদের বাড়ি যেতে পারে না৷ বিকাল হলে তাকে দেখার জন্য বাড়ির বাইরে দাঁড়ায়৷ বাবু, নিতু আর সি পেইয়ের বের হওয়ার অপেক্ষা করে৷ বের হলে মরে হয় বিকালটা সার্থক৷ সবাই চায় সি পেইয়ের দৃষ্টি আকর্ষর্ণ করতে৷ সারাটা পথ সি পেই মাথা নোয়াতে নোয়াতে চলে৷ তাই দেখে ছেলে-বুড়ো সকলে হাসে৷ সবাই ভাবে তাদের বাড়ির সোমত্ত মেয়েটাকে জাপান ফেরতা বাবু বিয়ে করলেও তারা এতটা খুশি হতো না, যতটা খুশি তারা সি পেইয়ের আগমনে৷ জাপানি রান্নাগুলো আয়ত্ত করার পর ফাতেমা চান বাবুর বিয়ের অনুষ্ঠান হোক৷ জাপানি বউয়ের বউভাতের অনুষ্ঠানে তিনি সবাইকে জাপানি খাবার খাওয়াবেন৷ যেই ভাবা সেই কাজ৷ আত্মীয়-স্বজন, প্রতিবেশীদের দাওয়াত দিয়ে তিনি রাঁধতে বসেন৷ ছোট্ট সি পেই আর নিতু তাকে সাহায্য করে৷ প্রতিবেশী মেয়েদের সাহায্যে নিতু পুরো একতলা বাড়িটাকে রঙিন কাগজ আর ফুল দিয়ে সাজায়৷ পাড়ার ছেলেরা অনুষ্ঠানে সি পেই বসবে বলে একটা উঁচু মঞ্চ বানায়৷ বিকাল বেলা সবার আসার সময় হলে সি পেই জাপানি পোশাক পরে সেই মঞ্চের আসনে বসে৷ বাবু জাপান থেকে আনা সাউন্ড সিস্টেমে সি পেইয়ের প্রিয় একটা গান চালিয়ে দেয়৷ উপহারে উপহারে ভরে যায় মঞ্চ৷ উঁচু থেকে মাথা ঝুঁকিয়ে কৃতজ্ঞতা জানায় সি পেই৷ ধন্যবাদ দেয়৷ বাবুর প্রতি তার প্রেম আরও বেড়ে যায়৷ জাপানে ফেলে আসা বাবা-মাকে ফিসফিস করে জানায়, দেখ বাবা-মা আমি কত সুখী৷ মনটা আনন্দে ভরে ওঠে৷ সি পেইয়ের দিনগুলো আর রাতগুলো ভালই কাটাচ্ছিল৷ সমস্যা নেই কিছুই, দেশটাকে নিজের ভাবতে মোটেও অসুবিধা নেই৷ মানুষগুলো সত্যিই তাকে আপন করে নিয়েছে৷ সামান্য সমস্যা আবহাওয়া৷ জাপান দেশটা ঠাণ্ডা৷ বাংলাদেশ হলো- গরম আর বৃষ্টির খনি৷ বৃষ্টি শুরু হলে কথাই নেই৷ জাপানেও বৃষ্টি প্রচুর হয়৷ তাই বৃষ্টিটা সয়ে গেলেও, গরম আর তার সয় না৷ একারণে যখন তখন ঘুমিয়ে পড়তো সে৷ বিশেষ করে বাড়ির ভেতরের বারান্দায় পাতা কাঠের চেয়ারে৷ ফাতেমার কাজ দেখতে দেখতে কখন যে ঘুমিয়ে পড়তো নিজেই জানতো না৷ অবশ্য বাড়ির লোকদের খারাপ লাগতো না ব্যাপারটা৷ সি পেই ঘুমাক আর জেগে থাকুক, তাকে সুন্দর দেখাতোই৷ ঘুম থেকে জাগলে তার শরীরের কাঠে লাগা অংশে দেখা যেত গভীর লাল দাগ৷ রফিক সাহেব একদিন সি পেইয়ের গালে এরকম লাল দাগ দেখে ভীষণ চিন্তায় পড়ে গেলেন৷ কিন্তু কারও সাথেই ব্যাপারটা নিয়ে কথা বললেন না৷ সন্ধ্যায় সোজা বাজারে গিয়ে ফোমের কুশন দেয়া একটা দোলনা কিনে আনলেন৷ নিজে দড়ি বেঁধে শক্ত করে বারান্দায় টাঙিয়ে সি পেইকে ডেকে তাতে বসালেন৷ বললেন, এখানে ঘুমাও মা৷ তার এই কাণ্ড দেখে তো ফাতেমা আর নিতু হেসেই খুন৷ কিন্তু সমস্যা হলো- তারা তো আর রফিক সাহেবের ব্যাপার নিয়ে প্রকাশ্যে হাসতে পারে না৷ তাদের চাপা হাসি অনেক সময় ধরে চলতে থাকলো৷ সি পেইয়ের হলো আরেক সমস্যা, বললেই তো আর ঘুমানো যায় না, তাই সে হাসি হাসি মুখ নিয়ে বাবার দিকে তাকিয়ে থাকলো৷ মনে মনে তার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করলো৷ পাড়ার সবাই কোনও না কোনও উপলক্ষে সি পেইয়ের প্রতি ভালোবাসা জানাবার পর রফিক সাহেবের ভালোবাসা প্রকাশিত হলো৷ তবুও সবাই খুশি, তাদের জানের জান সি পেই অবশেষে রফিক সাহেবের মতো রাশভারি লোকেরও মন পেল৷ কিন্তু এতো ভালোবাসা সি পেইয়ের সইলো না৷ অঘটন একটা ঘটলোই৷ সি পেইয়ের খুব সাইকেল চালাবার সখ ছিল৷ জাপানে তো সকলের সাইকেল আছে৷ কিন্তু আমাদের মফস্বল শহরেও সাইকেল চালানো খুব ঝক্কি৷ কিন্তু সি পেইয়ের এমনই শখ, কাউকে সাইকেল চালাতে দেখলে তার এক চক্কর চালানো চাই-ই চাই৷ এই দেখে রফিক সাহেব বাজার থেকে একটা সুন্দর সাইকেল কিনে আনলেন৷ সি পেই মহা খুশি৷ সন্ধ্যা ঘনিয়ে এলো, তবু সে সাইকেলে চক্কর মারছে তো মারছেই৷ শেষ পর্যন্ত ভূতের ভয় দেখিয়ে তাকে ক্ষান্ত করা হলো৷ সেদিনই রাত দশটার কাহিনী৷ ছেলে-পুলে দু’একজনের চলাফেরা ছাড়া রাস্তায় কেউ নেই৷ হঠাত্‍ দুএকটা রিকশার টুংটাং৷ ব্যস এইটুকুই শব্দ৷ রাস্তায় ল্যাম্পপোস্টের মৃদু আলো৷ এই নিরবতা খানখান করে হঠাত্‍ কয়েকটা গাড়ির শব্দ কানে এলো৷ রাস্তার ছেলেপুলেদের হুড়োহুড়িতে সজাগ হয়ে উঠলো সবাই৷ বাড়ি থেকে কেউ বের হলো না বটে কিন্তু নিঃশব্দ বেড়ালের মতো কান খাড়া করে রইলো৷ পুলিশ ঘিরে ফেলেছে পুরো পাড়া৷ কেউ ভেয়ে পাচ্ছে না, এ পাড়ায় কে এমন সন্ত্রাসী যে তাকে ধরতে পুরো পাড়াটাই ঘিরে ফেলতে হচ্ছে৷ হয়তো অন্য এলাকা থেকে আসা কোনো সন্ত্রাসী লুকিয়ে আছে, ভাবলো কেউ কেউ৷ কিন্তু পুলিশের একটা দল যখন বিদেশী কয়েকটা লোক ও একটা মহিলাসহ বাবুদের বাড়ির দিকে এগিয়ে যেতে থাকলো তখন সবাই বুঝলো এ সন্ত্রাস-মন্ত্রাস নয়, রহস্য অন্যকিছু৷ একে একে সাহস করে একজন দু’জন এগিয়ে যেতে থাকলো বাবুদের বাড়ির দিকে৷ সে বাড়িতে ততক্ষণে কান্নার রোল৷ যেই গেল সেই কাঁদতে থাকলো বৃত্তান্ত শুনে৷ নিতু ফাতেমা তো বটেই, সি পেইও বাঙালিদের মতো শোর করে কাঁদছে৷ পুলিশসহ কয়েকটা জাপানি লোক আর জাপানি মহিলাটি ঘিরে আছে রফিক সাহেব আর বাবুকে৷ সি পেইয়ের বাবা-মা জাপান দূতাবাস আর বাংলাদেশ সরকারের সহায়তায় তাকে উদ্ধার করতে এসেছে৷ তাদের অভিযোগ, বাবু তাকে অপহরণ করে এদেশে নিয়ে এসেছে৷ রফিক সাহেব যতোই বোঝান ওরা ভালোবেসেই বিয়ে করেছে ততোই নাখোশ হয় পুলিশ৷ বলে, সরকার চায় না সি পেই এখানে থাকুক৷ জাপানি মেয়েটি জাপানে ফিরলেই শুধু সরকারের শান্তি৷ পুলিশ হুংকার ছাড়ে আর জাপানি লোকগুলো কিচির মিচির করতে থাকে৷ সি পেইয়ের বয়স আঠারো হয়নি৷ আঠারোর নিচের কোন মেয়েকে বাবা-মায়ের অনুমতি ছাড়া বিয়ে করা মানে অপহরণ৷ ফোঁপাতে ফোঁপাতে সি পেই প্রতিবাদ করতে থাকলো৷ বললো, সে যথেষ্ট বড়৷ বুঝেশুনেই তাকে বিয়ে করেছে৷ এখানে থাকতে চায় সে৷ কোথাও যেতে চায না৷ বাবা-মা তার দিকে এলেই খামচে তাদের দূরে সরিয়ে দিতে থাকলো৷ সময় যাচ্ছিল, একটু একটু করে ভীড়ও বাড়ছিল৷ লোকসংখ্যা বাড়ায় ভড়কে গেল পুলিশ আর জাপানিরা৷ পাড়ার লোকজন সাফ জানিয়ে দিল, সি পেই যেহেতু চায় না তাই কোনো শক্তিই তাকে পাড়ার বাইরে নিয়ে যেতে পারবে না৷ অবস্থা খারাপ দেখে জাপানিরা ফিসফাস করে পুলিশের সাথে কথা বললো৷ তারপর পুলিশ, পাড়ার মুরুবি্ব এবং বাবুদের পরিবারকে নিয়ে মিটিং ডাকলো৷ মিটিং শুরুর আগে সিদ্ধান্ত যা হয় তা সবাইকে মেনে নিতে অনুরোধ করলো পুলিশ৷ শুরুতেই সি পেইয়ের বাবা-মা বাবুর সাথে তার বিয়ের ব্যাপারটা মেনে নিল৷ বললো, মেয়ে ভুল করলেও তার ভালোবাসা তো ভুল হতে পারে না৷ উপস্থিত সবাইকে ধন্যবাাদ জানালো তারা তাদের মেয়ে এতটা আপন করে নিয়েছে বলে৷ রফিক সাহেব ও ফাতেমার প্রতি সম্মান দেখালো৷ বললো, সি পেইয়ের বয়স সামনের অক্টোবরে আঠারো হবে৷ তারা চায় নভেম্বরেই জাপানি রীতিতে আবার সি পেই ও বাবুর বিয়েটা সেরে ফেলতে৷ জাপানে তাদের বন্ধুরা নইলে খুবই নাখোশ হবে৷ তখন বাবুসহ পুরো পরিবারকেই জাপান গিয়ে সি পেইকে নিয়ে আসতে হবে৷ তবে তার আগের কয়েকটা মাস মেয়ে তাদের সঙ্গেই থাক৷ এই সময়টায় বাবা-মা তাকে অন্তর দিয়ে ভালোবাসতে চান৷ বাকী জীবন তো এখানেই থাকবে৷ ব্যাপারটার সহজ সমাধান পেয়ে সবাই হাফ ছেড়ে বাঁচলো৷ বললো, আসলেই জাপানিরা ভদ্র জাতি৷ সি পেইও মেনে নিল৷ বাবুর মা-বাবা, পাড়া-প্রতিবেশী সবাই অনুরোধ জানালো রাতটা তাদের সাথে কাটাতে৷ কিন্তু ভোরেই জাপানের ফ্লাইট বলে তারা সি পেইকে আদর করে গাড়িতে তুললেন৷ কেঁদে-কেটে সবার কাছে বিদায় নিয়ে জাপান চলে গেল সি পেই৷ ঘুম থেকে জেগে পাড়ার বাচ্চারও তাকে হাত নেড়ে বিদায় জানালো৷ সি পেই বললো ফিরবে সে আবার এই নভেম্বরেই৷ পাড়ায় ফিরে সাইকেল চালিয়ে বেড়াবে৷ তখন সবার সঙ্গে আবার দেখা হবে৷ সি পেই বিহীন পাড়ায় পরদিন থেকে একটা অদ্ভূত নিরবতা নেমে এলো৷ সব কিছুই এলোমেলো হয়ে যেতে থাকলো৷ দিন যেতে যেতে এক সময় পুুরো পাড়াটাই স্থবির নির্বাক হয়ে পড়লো৷ বাবু শুকাতে শুকাতে, চুপচাপ থাকতে থাকতে নিজের ভেতর সেঁধিয়ে গেল৷ অক্টোবর-নভেম্বর চলে গেলেও জাপান থেকে কোনো চিঠিপত্র বা দাওয়াত এলো না৷ পাড়ার বিষণ্ন ভাবটাই শেষ পর্যন্ত চিরস্থায়ী হয়ে গেল৷ প্রিয়, হাসিখুশি, পুতুল পতুল, নরম মাখন মাখন সি পেই আর কখনও ফিরে আসেনি৷

অক্টোবর, ২০০৫

মার্চ 5, 2006

Mahbub Morshed


mahbub morshed